Reflection / Curiosity / Learning
আবার নতুন করে শুরু
পাহাড়, নদী, সাইকেল আর কোড—অপরিচিতের কাছে কেন বারবার ফিরি, আর নতুন করে শুরু করা কীভাবে মন দিয়ে দেখতে শেখায়।

এই পোর্টফোলিওতে আমার জীবনের তিনটি দিক আছে: অভিযান, সফটওয়্যার তৈরি আর পড়াশোনা। বাইরে থেকে কাজগুলো আলাদা মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এগুলোর শুরু একই জায়গায়—যেটুকু বুঝি, তার বাইরে আর কী আছে, তা জানার ইচ্ছায়।
কখনো সেই ইচ্ছা আমাকে পাহাড়ে নিয়ে যায়। কখনো নদীতে, মালবোঝাই সাইকেলের পাশে, কিংবা এমন কোনো সফটওয়্যারের সামনে, যা এখনও আমার চাওয়ামতো কাজ করছে না। জায়গা বদলায়। পুরো উত্তর না জেনেও শুরু করার আগ্রহটা থেকে যায়।
আবার নতুন হওয়া সব সময় স্বস্তির নয়। তবু বারবার পথে নামার একটি কারণ এই নতুন হয়ে ওঠা।
অভিজ্ঞতা থাকলেও সব পথ চেনা হয় না
পিসাং পিকে প্রথমবার চূড়ার দিকে এগিয়ে ৬,০৬১ মিটার থেকে ফিরে এসেছিলাম। চূড়া কাছেই ছিল, কিন্তু হাতে থাকা সময় আর আবহাওয়া মিলিয়ে নিরাপদে ফেরার ব্যাপারে সংশয় ছিল। তাই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিই। দ্বিতীয় চেষ্টায় ৬,০৯১ মিটারের চূড়ায় পৌঁছাই।
কাগজে দুটি উচ্চতার ব্যবধান সামান্য। মাঝখানের সিদ্ধান্তটি সামান্য ছিল না। প্রস্তুতি কাজে লেগেছে, কিন্তু আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী পাহাড়ের পরিস্থিতি বদলায়নি। সামনে যা ছিল, তা বুঝেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
অভিজ্ঞতার এই সীমাটা মনে রাখা দরকার। আগের শেখা কাজে লাগে, কিন্তু নতুন করে দেখার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। নতুন একটি পথ এমন প্রশ্ন তুলতে পারে, যার উত্তর আগে কখনো দিতে হয়নি। কখন থামতে হবে, তা বোঝাও এগিয়ে যাওয়া শেখার অংশ।
চলার ধরন বদলালে দেখাও বদলায়
তিস্তা–টেকনাফে কায়াক নিয়ে বাংলাদেশের নদীপথে চলেছি: ৯৫০ কিলোমিটারের বেশি পথ, ২৫টি জেলা, ৪৮ দিনজুড়ে একটি যাত্রা। লঙ্কাচক্রে সুবাহ আর আমি সাইকেলে শ্রীলঙ্কা ঘুরেছি—প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার, ২১ দিন সাইকেল চালানো; এর বাইরে ছিল বিশ্রাম আর কাজের দিন।
দুটিই দীর্ঘ যাত্রা, কিন্তু দুটির চাওয়া এক ছিল না। নদীতে দূরত্বের সঙ্গে সম্পর্ক একরকম, সড়কে আরেকরকম। কায়াক আর সাইকেল সঙ্গে করে ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে চলে। বাহন বদলালে কী দেখি, কার সঙ্গে দেখা হয়, কী শিখতে হয়—সেসবও বদলে যায়।
লঙ্কাচক্রে আমাদের কাজও সঙ্গে ছিল। কেউই পুরো সময়ের ছুটি নিইনি। সকালে সাইকেল চালানো, মাঝখানে কাজ, তারপর আবার পথে নামার পরিকল্পনাকে প্রতিদিনের বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে হয়েছে। কোনো কোনো সকাল শুরু হয়েছে জমে থাকা অফিসের কাজ দিয়ে, দূরত্ব পেরোনো দিয়ে নয়।
চলতে ভালো লাগে। খোলা প্রকৃতি, সামনে বাঁক নেওয়া পথ, নতুন কোনো জায়গায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা আমাকে টানে। তবে ঘরে ফিরিয়ে আনা গল্পে সেই মানুষদেরও জায়গা আছে, যাঁদের সাহায্যে পথটা পেরোনো সম্ভব হয়েছে। নিজের দায়িত্বে অভিযান করলেও মানুষের আন্তরিকতার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় না। নিজের ওপর নির্ভর করতে পারা মানে অন্যের কাছ থেকে শেখার আর কিছু নেই—এমন ভাবার সুযোগ নেই।
ডেস্কেও সেই কৌতূহল
সফটওয়্যার তৈরির কাজে একই কৌতূহলের আরেকটি জায়গা পাই। একটি ধারণাকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা, ইন্টারফেস সহজ রাখা আর বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজা আমার ভালো লাগে। কোনো কিছু কেন কাজ করছে না, তা বোঝা এবং পরের সংস্করণকে একটু ভালো করার মধ্যেও আনন্দ আছে।
অপরিচিত কোড বুঝতে ধৈর্য লাগে। বদলানোর আগে জানতে হয় সেটি এখন কী করছে, কোন ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, আর আমার নিজের বোঝায় কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রথম যে সমাধান মাথায় আসে, সমস্যাটির জন্য সেটিই সবচেয়ে উপযুক্ত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
পড়াশোনাতেও এমন হয়। পাতার প্রতিটি শব্দ চেনা থাকতে পারে, অথচ লেখকের যুক্তিটা ঠিক বুঝে ওঠা হয়নি। সেই ফাঁকটা খেয়াল করা, আরও ভালো একটি প্রশ্ন করা এবং উত্তর খুঁজতে আরেকটু এগোনোর মধ্যেই শেখার শুরু।
অভিযানের তুলনায় এসব কাজ অনেক শান্ত। তবু একই জীবনের অংশ। প্রকৃতির মধ্যে চলার মতোই কিছু তৈরি করা আর কোনো বিষয় বুঝতে পারাও আমার ভালো লাগে। এক জায়গার অভিজ্ঞতা অন্য জায়গায় নতুন করে ভাবার খোরাক দেয়।
না জানার জন্য জায়গা রাখি
নতুন করে শুরু করা মানে আগের শেখা ফেলে দেওয়া নয়। যা শিখেছি তা সঙ্গে রেখেও মেনে নেওয়া যে, সব প্রশ্নের উত্তর সেখানে নেই।
প্রস্তুতি নিতে পারি, সাহায্য চাইতে পারি, ছোট একটি পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করতে পারি। পরিস্থিতি বদলালে পরিকল্পনাও বদলাতে পারি। কোনো ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ, কিংবা কোনো পথ আরেকবার দেখে নেওয়া দরকার—এটুকু স্বীকার করলে আগের পরিশ্রম মুছে যায় না। পরের সিদ্ধান্তটা আরও সৎ হয়।
এভাবেই নতুন থাকতে চাই: অভিজ্ঞতা আছে, তবু শোনার আগ্রহ আছে; লক্ষ্য ধরে কাজ করি, তবু ফলাফল নিশ্চিত বলে ধরে নিই না।
আরও পথ চলতে চাই, আরও কিছু তৈরি করতে চাই, আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর বুঝতে চাই। প্রতিটির শুরুতেই বিশেষজ্ঞ হয়ে পৌঁছানোর দরকার নেই। শুরু করার মতো কৌতূহল, প্রস্তুতির যত্ন আর পথে শিখতে থাকার মতো মনোযোগ থাকলেই এগোনো যায়।
কৌতূহলী থাকুন। এগিয়ে চলুন।
আরও পড়ুন

অভিযান
বঙ্গচক্র: বাংলাদেশের সীমান্তরেখা ধরে ৫,০০০+ কিলোমিটারের সাইকেল অভিযান
বাংলাদেশের প্রান্ত ঘিরে পরিকল্পিত ৯০ দিনের সাইকেলযাত্রার অংশীদারিত্ব প্রস্তাব। প্রায় ৪০ জেলার মানুষ, পথ ও গল্পকে কমিউনিটি রাইড এবং মাঠপর্যায়ের কনটেন্টে যুক্ত করার উদ্যোগ।

ফটোবুক
পাহাড়ের আলো ছোঁয়া: হিমালয়ের শীতের ফটোবুক
নেপালে ইনতিয়াজ মাহমুদের ২০২০ সালের শীতকালীন অভিযানের ছবি—হিমালয়ের নীলচে আলো, ঝরে পড়া তুষার আর সাদাকালো শৈলশিরা।

অভিযান
সুরমা–সুন্দরবন: বাংলাদেশে পরিকল্পিত একক কায়াক অভিযান
বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের পরিকল্পিত একক কায়াক অভিযান। ইনতিয়াজ মাহমুদের সঙ্গে নদী, মানুষ ও পথের গল্পে অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ।

অভিযান
লঙ্কাচক্র: সাইকেলে শ্রীলঙ্কার চারদিকে ১,৫০০ কিলোমিটার
সুবাহকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীলঙ্কার চারদিকে সাইকেলযাত্রা— ২১ রাইডিং ডে, তীব্র গরম, হেডউইন্ড, অফিসের কাজ, বন্যপ্রাণী আর অচেনা মানুষের ভালোবাসা।
