পর্বতারোহণ / একক আরোহণ / নেপাল / শীতকালীন অভিযান
পিসাং পিক সোলোঃ বাংলাদেশের প্রথম সফল শীতকালীন সোলো পর্বতারোহণ অভিযান
নেপালের ৬,০৯১ মিটার পিসাং পিকে শীতকালীন, সেলফ-সাপোর্টেড আরোহণ — বাংলাদেশের কোনো পর্বতারোহীর প্রথম একক ছয়-হাজারী সামিট।

একা আরোহণের স্বপ্ন
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে একটা কঠিন ইচ্ছা মাথায় ঘুরছিল—কোনো গাইড, পোর্টার, কুক বা টিমমেট ছাড়া একা একটি হিমালয় পর্বতে আরোহণ করব। কয়েকটি সেলফ-সাপোর্টেড অভিযানের পর বুঝেছিলাম, নিজের বোঝা ও সিদ্ধান্ত নিজের কাছে রাখার মধ্যে আলাদা আকর্ষণ আছে। সোলো মাউন্টেনিয়ারিং সেই ভাবনার সবচেয়ে ধারালো রূপ। বোঝা, পথ, ভুল আর তার পরিণতি—সবই আমার।
৬,০৯১ মিটার উঁচু পিসাং পিক অন্নপূর্ণার কাছে তীক্ষ্ণ পিরামিডের মতো উঠে গেছে। যথেষ্ট উচ্চতা, টেকনিক্যাল ক্লাইম্ব এবং পরিচিত ট্রেকিং রুটের কাছাকাছি অবস্থান—সব মিলিয়ে পরিকল্পনাটি সম্ভব মনে হয়েছিল। বেছে নিয়েছিলাম শীতকাল। পারমিটের খরচ কম, কিন্তু ঠান্ডা, তুষার আর ফাঁকা পাহাড়ের ঝুঁকি অনেক বেশি।
এটা শুধু একটি সামিট পরিকল্পনা ছিল না। লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের কোনো পর্বতারোহীর প্রথম একক ছয়-হাজারী সামিট।

পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছানোও ছিল অভিযান
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরিকল্পনা তৈরি, কিন্তু টাকার হিসাব মিলছিল না। নতুন গিয়ার না কিনেও ন্যূনতম বাজেট আমার সামর্থ্যের বাইরে। মুনিম ক্রাউডফান্ডিংয়ের কথা বলল। নির্ধারিত যাত্রার এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এমনভাবে পাশে দাঁড়ালেন যে একেবারে টেনেটুনে অভিযানটি সম্ভব হলো।
ফ্লাইটের এক দিন আগে কাঠমান্ডুর টিকিট কেটে ১৬ ফেব্রুয়ারি নেপালে পৌঁছালাম। এরপর পারমিট, বিভ্রান্তিকর প্রস্তাব, শেষ মুহূর্তের সরঞ্জাম গোছানো, পাসপোর্ট ও টাকা হারানো—একের পর এক সমস্যা এসেছে। শেষ পর্যন্ত ক্লাইম্বিং পারমিট ও সামনে এগোনোর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা হলো।
২২ ফেব্রুয়ারি বেসিসহরের বাসে উঠলাম। পরদিন ধিকুর পোখরি হয়ে আপার পিসাংয়ের দিকে এগোলাম। গাড়ি বা পোর্টারের খরচ সামর্থ্যের বাইরে। তাই অভিযানের মালপত্র নিজেই দুবারে শেষ গ্রামে তুলেছি, তারপর ৩৪ কেজির বেশি বোঝা কাঁধে নিয়ে পাহাড়ে উঠেছি।

দুইয়ের বদলে তিন ক্যাম্প
সাপোর্টেড দলগুলো আপার পিসাংয়ের ওপরে সাধারণত দুই ক্যাম্পে সামিটে যায়। খাবার, জ্বালানি, তাঁবু, টেকনিক্যাল সরঞ্জাম—সব একা বহন করায় আমার লেগেছে তিন ক্যাম্প। প্রথমটি প্রায় ১৩,৯০০ ফুটে, দ্বিতীয়টি ১৫,৫০০ ফুটে। কোনোটির কাছেই সহজ পানির উৎস ছিল না। কোনো কোনো জায়গায় ঝোপের ওপর জমে থাকা তুষার সংগ্রহ করে পানি বানিয়েছি।
তিন দিনে প্রায় ১৭,৫৫০ ফুটের সামিট ক্যাম্পে পৌঁছাই। সরু রিজের ছোট জায়গা, দুই পাশেই খাড়া ঢাল। দক্ষিণ-পশ্চিমে অন্নপূর্ণা, উত্তর-পশ্চিমে দূরে চলে গেছে মানাং ভ্যালি। রাতে নিচের গ্রামের মিটমিটে আলোই মনে করিয়ে দিত, মানুষের পৃথিবী এখনো আছে।

প্রথম পুশ: ত্রিশ মিটার নিচে ফিরে আসা
এক দিন বিশ্রামের পর রাতে বের হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ঠান্ডা ও ক্লান্তির কাছে অ্যালার্ম হেরে গেল; তাঁবুর বাইরে পা রাখতে সকাল সাতটা পার। ক্যাম্পের বিশ মিনিট ওপরে রুট খাড়া হয়ে পাথরের দেয়ালে উঠে গেছে। শীতে রুটটি আমার পড়াশোনা করে আসা বর্ণনার সঙ্গে মিলছিল না।
সামনে কয়েকশ মিটার জুড়ে ৬০–৮০ ডিগ্রির নড়বড়ে রক পিচ। তৈরি ফিক্সড রোপ নেই, বিলে দেওয়ার সঙ্গীও নেই। পাহাড়ে ফেলে যাওয়া পুরোনো রোপের অংশ পেলাম; সেগুলো সঙ্গে নিয়ে যতটা সম্ভব প্রোটেকশন তৈরি করেছি। ওঠার মধ্যে হেলমেটের স্ট্র্যাপ খুলে গেল। হেলমেটের সঙ্গে ধার করা অ্যাকশন ক্যামেরা ও অনেক ফুটেজ চোখের সামনে ঢাল বেয়ে হারিয়ে গেল।
দুপুরের পর রক সেকশন পার হয়ে তুষারের অংশে এলাম। জিপিএসে পরে ৬,০৬১ মিটার দেখা গেছে—সামিটের স্বীকৃত উচ্চতা থেকে মাত্র ৩০ মিটার নিচে। কিন্তু আসল চূড়ায় পৌঁছাতে সময় লাগবে, আর ওঠা প্রতিটি মিটার একাই নামতে হবে। মেঘ জমছিল। বেলা প্রায় সাড়ে তিনটায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।
নামতে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগল। ক্যাম্পে ফিরে এক গ্লাস পানি খেয়ে রাত তিনটা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি। জেগে সবচেয়ে কঠিন যে কথাটা মাথায় এল: সামিট করতে হলে পুরো পথ আবার উঠতে হবে।

আবার ওপরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত
পরের দিন শরীর সামলাতে আর দ্বিতীয় চেষ্টা করা দায়িত্বশীল হবে কি না ভাবতে কেটেছে। স্যাটেলাইট ফোনে পাওয়া পূর্বাভাসে দুপুরের পর আবহাওয়া খারাপ হওয়ার আগে সরু একটা উইন্ডো ছিল। ক্যাম্পের তাপমাত্রা প্রায় –২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছিল। ভোরের আগে বাইরে পা রাখা তখনও মানসিক যুদ্ধ।
দ্বিতীয় পুশে চেনা পথ দ্রুত পেরিয়েছি। প্রথম দিনের ফিক্স করা রোপ খাড়া অংশে কাজে দিয়েছে। রক সেকশনের পরে তুষার ও বরফ শুরু, আর পাহাড় মেঘে হারিয়ে গেছে।

চূড়ার কাছে পাশাপাশি তিনটি প্রায় সমান উঁচু বিন্দু সামনে এল। শীতের তুষারে প্রেয়ার ফ্ল্যাগ ও পরিচিত সামিট মার্কার চাপা। জিপিএস বলল, শেষের বিন্দুটিই সামিট। প্রথম দুইটি পেরিয়ে উন্মুক্ত রিজ ধরে এগিয়ে ৪ মার্চ ২০২৩ বেলা প্রায় তিনটায় তৃতীয় চূড়ায় পৌঁছালাম।
যন্ত্রে ৬,০৯৬ মিটার দেখাচ্ছিল; পিসাং পিকের স্বীকৃত উচ্চতা ৬,০৯১ মিটার। বাংলাদেশের পতাকা মেলে চূড়ায় একা দাঁড়ালাম। আমার জানা তথ্য ও অভিযানের পর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি ছিল বাংলাদেশের কোনো পর্বতারোহীর প্রথম একক ছয়-হাজারী সামিট।

সামিট ছিল অর্ধেক পথ
সামিটে পৌঁছানোর আগেই হালকা তুষার পড়ছিল। পূর্বাভাসের ঝড় দেরিতে এসেছিল; সেই সামান্য দেরিই আমাকে সামিটের সময় দিয়েছে। কিন্তু নিরাপদে নামার সময় দেয়নি।
চারপাশ দ্রুত হোয়াইটআউটে ঢেকে গেল। বাতাস তুষারকে আড়াআড়িভাবে মুখে ছুড়ে মারছিল। ওঠার ট্র্যাক মুছে গেছে, রুটও দেখা যাচ্ছে না। ফোনের জিপিএস ব্যবহার করতে হলে তীব্র ঠান্ডায় হাত বের করতে হবে। খাড়া পিচগুলোতে রোপ ও পাথর ধরে নামলাম; পরে থেমে থাকার চেয়ে চলতে থাকা নিরাপদ মনে হওয়ায় আন্দাজে এগিয়েছি।

প্রায় তিন ঘণ্টা একা ঝড়ের সঙ্গে লড়েছি। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে মেঘের মধ্যে তাঁবু দেখা গেল। ফাইবার পোলের হালকা তাঁবুটি এত বাতাসে টিকবে কি না ভয় ছিল। রিজে সেটিকে তখনও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা ছিল অভিযানের সবচেয়ে স্বস্তির মুহূর্তগুলোর একটি।
ভেতরে ঢুকে দেখি তুষারগলা পানি ও ঘামে কাপড় ভেজা। স্লিপিং ব্যাগে শরীর ছেড়ে দেওয়ার পর রাত তিনটার আগে খুব বেশি কিছু মনে নেই। সামিট ছিল লক্ষ্য; ঝড় থেকে বেঁচে ফেরা আমার কাছে আরও বড় অর্জন হয়ে রইল।

মানুষের পৃথিবীতে ফেরা
পরদিন ক্যাম্প গুছিয়ে দুপুরের দিকে নামা শুরু করি। নতুন তুষারে নড়বড়ে পথ ঢাকা থাকায় প্রথম কয়েকশ মিটার পার হতে অনেক সময় গেছে। বেইসক্যাম্প পেরিয়ে রাত প্রায় নয়টায় পিসাং গ্রামের লজে পৌঁছাই। রাত দশটায় সামনে এল গরম নেপালি ডাল-ভাত।
হারানো পাসপোর্ট আর পাওয়া যায়নি। কাঠমান্ডু ফিরে পুলিশ রিপোর্ট, বাংলাদেশ দূতাবাসের ট্রাভেল পারমিট আর ভিসা ট্রান্সফারে আরও কয়েক দিন গেছে। পারমিটের বিভ্রান্তি, শেষ মুহূর্তের অর্থ জোগাড় আর হারানো কাগজপত্র—সবই একই অভিযানের অংশ হয়ে গেল।
পিসাংয়ে গিয়েছিলাম জানতে, নিজের সব সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিয়ে একা হিমালয়ের চূড়ায় দাঁড়াতে পারি কি না। ফিরে এসে বুঝেছি, সোলো ক্লাইম্বিংয়ে আত্মনির্ভরতা বড় হয়ে ওঠে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা সিদ্ধান্ত নেওয়া। সামিটের ৩০ মিটার নিচে ফিরে আসা ব্যর্থতা ছিল না। পরদিন আবার যাওয়া শুধু জেদও ছিল না। সময়, আবহাওয়া, শক্তি আর জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা—দুই সিদ্ধান্তেই সব কটির হিসাব ছিল।
সামিটের ছবি অর্জনটি ধরে রেখেছে। ফাঁকা ক্যাম্প, প্রথমবার ফিরে আসা আর নামার পথের ঝড় তার অর্থ বুঝিয়ে দেয়।
পিসাং পিক, অন্নপূর্ণা অঞ্চল, নেপাল · সামিটের উচ্চতা: ৬,০৯১ মিটার · ১৬ ফেব্রুয়ারি–৫ মার্চ ২০২৩
পথ
কাঠমান্ডু → বেসিসহর → ধিকুর পোখরি → আপার পিসাং → বেইসক্যাম্প → সামিট ক্যাম্প → পিসাং পিক
সময়রেখা
- ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ — পারমিট ও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির জন্য কাঠমান্ডু পৌঁছাই।
- ২২ ফেব্রুয়ারি — কাঠমান্ডু থেকে বেসিসহর হয়ে আপার পিসাংয়ের পথে যাত্রা শুরু।
- প্রথম সামিট পুশ — নিরাপদে ফেরার সময় ও আবহাওয়া বিবেচনায় ৬,০৬১ মিটার থেকে ফিরে আসি।
- ৪ মার্চ — দ্বিতীয় পুশে বেলা প্রায় তিনটায় ৬,০৯১ মিটার সামিটে পৌঁছাই।
- ৫ মার্চ — সামিট ক্যাম্প গুটিয়ে পিসাং গ্রামে নেমে আসি।
সংবাদ প্রকাশনা
এই অভিযানের প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার ও ফিচার। মূল সংবাদ পড়তে বা দেখতে নিচের সংবাদচিত্রে চাপ দিন।
সম্পূর্ণ সংবাদ সংগ্রহশালা দেখুন ↗আরও পড়ুন

অভিযান
শীতকালীন অভিযান ২০২০: নেপাল হিমালয়ে একটি সেলফ-সাপোর্টেড পর্বতারোহণ অভিযান
দ্য কোয়েস্টের সঙ্গে নেপালে ইনতিয়াজ মাহমুদের ২০২০ সালের শীতকালীন অভিযান। হিমালয়ের ছবি, অভিযানের প্রস্তুতি ও চুলু ফার-ইস্ট আরোহণের মূল পরিকল্পনা।

অভিযান
বঙ্গচক্র: বাংলাদেশের সীমান্তরেখা ধরে ৫,০০০+ কিলোমিটারের সাইকেল অভিযান
বাংলাদেশের প্রান্ত ঘিরে পরিকল্পিত ৯০ দিনের সাইকেলযাত্রার অংশীদারিত্ব প্রস্তাব। প্রায় ৪০ জেলার মানুষ, পথ ও গল্পকে কমিউনিটি রাইড এবং মাঠপর্যায়ের কনটেন্টে যুক্ত করার উদ্যোগ।

অভিযান
সুরমা–সুন্দরবন: বাংলাদেশে পরিকল্পিত একক কায়াক অভিযান
বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের পরিকল্পিত একক কায়াক অভিযান। ইনতিয়াজ মাহমুদের সঙ্গে নদী, মানুষ ও পথের গল্পে অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ।

অভিযান
লঙ্কাচক্র: সাইকেলে শ্রীলঙ্কার চারদিকে ১,৫০০ কিলোমিটার
সুবাহকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীলঙ্কার চারদিকে সাইকেলযাত্রা— ২১ রাইডিং ডে, তীব্র গরম, হেডউইন্ড, অফিসের কাজ, বন্যপ্রাণী আর অচেনা মানুষের ভালোবাসা।

